বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ০৭:৩০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে করোনার হার জেলায় সর্বোচ্চ: স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক খুলনা বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় ৩১ জনের মৃৃত্যু।  টানা ভারী বর্ষণে পানির নিচে কক্সবাজার পাহাড় ধ্বসে একই পরিবারের পাঁচজন নিহত কুষ্টিয়ায় লকডাউনের ২৯তম দিনেও কঠোর অবস্থানে পুলিশ  আরিফুল ইসলামের ভাইরাল হওয়া পোস্ট: মহেশখালী উত্তর উপজেলা-থানা বাস্তবায়ন প্রসংগ চকরিয়ায় করোনা বিপর্যস্ত মানবতার পাশে “একেএমবি আন্জুমানে খুদ্দামুল মুসলিমিনের এম্বুলেন্স সেবা” খুলনা বিভাগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে আবার ও ৪৬ জনের মৃত্যু। চকরিয়ার ঐতিহ্যবাহী বদরখালী বাজারে দূর্ধর্ষ চুরি ঈদগাঁওকে নবম উপজেলায় রূপান্তরিত, প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানালেন কউক চেয়ারম্যান ফোরকান। নওগাঁয় পুকুরে ডুবে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু 

নিবেদিত একজন শিক্ষাগুরুর গল্প….

  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ জুন, ২০২০, ১২.২৬ এএম
  • ১২৯ বার পঠিত

সাদ্দাম হোসেন, কক্সবাজার

বৈরী পরিবেশে নিবেদিত একজন শিক্ষাগুরুর এমন বিদায়-বিশ্বাস করতে পারছিলনা উপস্থিত শিক্ষার্থীরা। কলেজে বর্তমানে ১৩টি সম্মান কোর্সসহ ১৪টি বিভাগে পড়ছে ১৩ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী। প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানাতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী সাগর-নদী-পাহাড় পেরিয়ে ছুটে আসে ক্যাম্পাসে।বিদায়ের করুণ সূরে সবার অন্তর ভারাক্রান্ত, বিষন্নতায় আচ্ছন্ন তাদের হৃদয় মন।হাজারো চোখ সিক্ত অশ্রু-জলে।

বক্তব্যের একেবারে শেষ মুহুর্তে প্রিয়শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে অধ্যক্ষ একেএম ফজলুল করিম চৌধুরীর বাণী, তোমাদের প্রতি আমার বিশেষ অনুরোধ- ‘ভালো করে লেখাপড়া শিখে মানুষ হও। আত্মনির্ভলশীল এবং আত্মপ্রত্যয়ি মানুষ হও।সৃজনশীল সৃষ্টিশীল সৎ মানুষ হও। দেশপ্রেমিক মানুষ হও, দেশ-জাতি উপকৃত হবে। মানুষ তোমাদের মনে রাখবে’।

অনুষ্টান শেষ। শিক্ষার্থীরা স্যারকে ঘিরে ধরলো। পা ছুঁয়ে সালাম করতে করতে কেউ কেউ শুরু করলো কান্নাকাটি। প্রিয় স্যারের সাথে মুঠোফোনে সেলফি তুলতেও ভুলছেনা অনেকে। এমন বিদায় কজন বা পাই।

অধ্যক্ষ স্যার তাঁর প্রিয়শিক্ষার্থীদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আবার বললেন, ‘সৃজনশীল-আলোকিত মানুষ হও, পৃথিবী তোমাদের মনে রাখবে, দোয়া রইল..
সন্ধ্যার আগে সবাইকে রেখে ক্যাম্পাস ত্যাগ করলেন প্রিয় অধ্যক্ষ স্যার। এটা তাঁর অবসরজনিত বিদায়। স্যারের বিদায়ে হতবাক শিক্ষার্থীরা । শেষ মূহুর্তে হতাশ মনে সবার রওয়ানা বাড়ির পথে, পেছন পড়ে আছে স্মৃতির ফাঁকা ক্যাম্পাস। যেখানে চলছে অদ্ভুত এক নীরবতা।

এতক্ষণ ধরে শিক্ষাগুরুর গণসংবর্ধনার যে বর্ণনা আপনারা পড়লেন, তা ছিল কাল্পনিক। করোনাকাল না হলে অধ্যক্ষ স্যারের বিদায় অনুষ্টানটা ঠিক এরকমই হতো বলে আমার বিশ্বাস।
শুধুই কি কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাঁকে বিদায়সংবর্ধনা দিতেন ? মোটেও না। কক্সবাজার শহরের আনাছে কানাছে বিদায় সংবর্ধনার ধুম পড়ে যেত। কারণ এই মানুষটা কক্সবাজারের নানা শ্রেণিপেশার মানুষের প্রাণ ছুঁতে পেরেছিলেন।
তাই তাঁর বিদায়দিনে শ্রেণিপেশার মানুষ চুপ মেরে বসে থাকতেন না। কিন্তু করোনাকাল সেটা হতে দিল না। স্যারও দেখতে পেলেন না-তা্ঁর প্রতি কক্সবাজারের মানুষের টান কতটুকু ? এটা তাঁর অবসরকালীন জীবনে বড় অপ্রাপ্তি হিসাবেই থেকে যাবে।

শিক্ষাগুরুর নিরব প্রস্থান…….

বিদায় কয়েক রকমের হয়। ক্ষণিক দেখার পর বিদায়, প্রিয়জনের মন থেকে বিদায়, কর্মজীবন শেষে বিদায় এবং চিরবিদায়। প্রতিটা বিদায়ের পেছনে কিছু না কিছু স্মৃতি জড়িয়ে থাকে। যেমন, প্রিয়জন মন থেকে বিদায় নিলে জীবনে সঙ্গী হয় দু:খ-কষ্ট আর বেদনা।

আগামি ৩০ জুন প্রফেসর একেএম ফজলুল করিম চৌধুরীর অধ্যক্ষ পদে চাকরির শেষ কর্মদিবস।এরপর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের অবসান। তিনি এ কলেজে যোগ দেন ২০১৩ সালের ১৫ এপ্রিল। ৩০ জুন পযন্ত এ কলেজে তিনি সময় দিয়েছেন দীর্ঘ ৭ বছর ২ মাস ১৫ দিন।এসময়ে তিনি কলেজের উন্নয়নে যথেষ্ট ভুমিকা রাখেন। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় গড়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন কলেজ ক্যাম্পাস।

ইতিমধ্যে ৬০ লাখ টাকায় বাণিজ্য ভবনের উর্ধমূখি সম্প্রসারণ (দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা) হয়েছে। ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকায় নির্মিত হয়েছে ছয়তলা বিশিষ্ট শেখ হাসিনা ছাত্রী নিবাস। ৫ কোটি ৩১ লাখ টাকায় হয়েছে নতুন একাডেমিক ভবন। বিজ্ঞান ভবন, জীববিদ্যাভবন দুইতলা থেকে উন্নিত হয়েছে চারতলায়।শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হয়েছে শিক্ষক পরিষদ মিলনায়তন। বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের ধ্যানজ্ঞান প্রসারে হয়েছে বিজ্ঞান ক্লাব।শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল চর্চার জন্য তৈরি হয়েছে বিজ্ঞান চত্বর।

আমাদের আমলে কলেজে বাস ছিল একটি। অধ্যক্ষ ফজলুল করিম চৌধুরীর যোগদানের পর যুক্ত হয় আরও দুটি বাস। একটি ২০১৬ সালে উপহারস্বরূপ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আরেকটি দিয়েছে জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক সংস্থা-ইউএনএইচসিআর, ২০১৯ সালে।
ক্যাম্পাসে পুরনো যে মসজিদ-তার দৃষ্টিনন্দন কাজটুকুও হয়েছে এই লোকটার হাতে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন তিনি।মুসল্লিদের অজু করার জন্য মসজিদের পাশে তৈরি করে দেন অজুখানা।

বৃষ্টি হলে মাঠে জমে যায় হাঁটু পানি, তখন ফুটবল খেলা যায়না। বিভিন্ন দাতা সংস্থার সহযোগিতায় তিনি সংস্কার করলেন সেই মাঠ। এখন সেই মাঠে সবসময় খেলাধুলা চলে। বসেবসে খেলাধুলা উপভোগের জন্য মাঠে তৈরি হয় মিনি গ্যালারি।শিক্ষার্থীদের পানীয় জলের সংকট নিরসনে ক্যাম্পাসে বসানো হয় বিশুদ্ধ পানির মটর,
শিক্ষার্থীদের টাকা লেনদেন সুবিধার জন্য ক্যাম্পাসে স্থাপন করা হয় বেসিক ব্যাংকের একটি শাখা। স্বাস্থ্যকর খাবার নিশ্চিতকরণে রয়েছে ক্যান্টিন ফুড কর্ণার।বিজ্ঞান ভবনের সামনে স্থাপন করা হয়।

কলেজের জায়গা-জমি দখল করে তৈরি হবে সড়ক-আবাসন প্রকল্প। দখলবাজদের পক্ষে সবাই চুপ। কিন্তু চুপ থাকতে পারেননি এই মানুষটি। চুপ থাকার বিপরীতে অফারও আসে মোটা অংকের। নির্লোভ প্রিন্সিপাল মুহুর্তে না করে দিলেন। দখলদারের বিরুদ্ধে মামলা টুকে দিলেন আদালতে।রক্ষা পেল কলেজের কয়েক কোটি টাকার মূল্যবান সম্পদ।

শিক্ষার্থীরা ময়লা আবর্জনা ফেলে নোংরা করে ক্যাম্পাস। আর অধ্যক্ষ সাহেব হেঁটে হেঁটে সে ময়লা নিজ হাতে তুলে নেন।শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অফিসে না বসে তিনি প্রায় সময় সাধারণ চেয়ার নিয়ে বসতেন বাইরে, কিংবা গাছের ছায়াতলে.

আর এই কারণেই তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে হয়ে উঠেন বাবার মতো, শিক্ষকের চেয়েও একটু বেশি বন্ধুসুলভ, খাটি একজন মানুষ রূপে।সকল শিক্ষার্থীদের তিনি সন্তানের মত আগলে রাখতেন।প্রতিদিন বিকাল বেলায় হোস্টেলে গিয়ে ছাত্রীদের খোঁজ নেওয়া তাঁর নিয়মের একটি। শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছেও তিনি ছিলেন প্রিয় ব্যক্তিত্ব। সবার সাথে তাঁর আচরণ বন্ধুসুলভ। তাঁর আমলে কলেজ ক্যাম্পাস ছিল প্রায় শান্ত, গল্ডগোল তেমন চোখে পড়েনি। সামাজিক-সংস্কৃতিক কর্মকান্ডসহ রাষ্ট্রীয় নানা কর্মসূচিতে মুখর ছিল পুরো ক্যাম্পাস। কলেজের শিক্ষার মানও আগের তুলনায় অনেক, আকাশ ছোঁয়া। এর পেছনেও অবসরে চলে যাওয়া মানুষটির অবদান অনস্বীকার্য।

এর আগে তিনি কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজেও অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।এ কলেজে তিনি ১ বছর ৩ মাস ৮ দিন (২০১০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ) দায়িত্বে ছিলেন। এসময়ও তিনি কলেজের যথেষ্ট উন্নয়ন করেন।কলেজের বর্তমান পাঁচতলা নতুন হোস্টেল,শহীদ মিনার, প্রশাসনিক ভবনের উর্ধমুখি সম্প্রসারণ, পাঠাগার, কম্পিউটার ল্যাব, বাণিজ্য বিভাগ চালু তাঁরই অবদান। যোগদানের পরপর তিনি মহিলা কলেজ প্রাঙ্গনটি সাজান ফুলের বাগান দিয়ে।ক্যাম্পাসে গেলেই রকমারি ফুলের সৌরভে জুড়িয়ে যেত মন-প্রাণ।যা এখন নেই।
জেলার অন্যতম দুটি সরকারি কলেজে তিনি একাধারে ৮ বছর ৫ মাস ২৩ দিন চাকরি করেন। জেলার ২৫ লাখ মানুষের কল্যাণে একাধারে এতোটা বছর ত্যাগের নজির সম্ভবত অন্যকোনো অধ্যক্ষের নেই। শিক্ষা ক্যাডারে তাঁর মোট চাকুরিকাল ছিল ৩২ বছর ৫ মাস ১ দিন।

এ দীর্ঘ চাকরিজীবনে তিনি সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, সিলেট এমসি কলেজ, চট্টগ্রাম হাজী মুহম্মদ মহসীন কলেজ, রাঙ্গামাটি কলেজ ও চট্টগ্রাম কলেজে শিক্ষকতা করেন। কক্সবাজার সরকারি কলেজে যোগদানের আগে চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে সচিবের দায়িত্বও পালন করেছিলেন কর্মট এই মানুষটি।
দীর্ঘ চাকরি জীবনে তিনি কোন দিন এক মিনিট বিলম্বে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেননি। কোনো সভা-সমাবেশে পৌছেছেন নির্দিষ্ট সময়ে আগেই। দুই ঈদের দুইদিন এবং সাথে আরো দুইদিনসহ চারদিন ছাড়া বছরে অন্যান্য দিন কাটিয়েছেন নিজ কর্মস্থলেই। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বিনাকারণে তিনি একদিনও ছুটি ভোগ করেননি।

শিক্ষকতা জীবনে অত্যন্ত মেধাবী, জ্ঞানী ও সৎ এই ব্যক্তির হাতে আলোকিত হয়েছে হাজারো প্রাণ। সেই প্রাণের ছোঁয়ায় গড়ছে সোনার বাংলাদেশ। অবসরকালীন সময়ে সোনার বাংলায় সেই প্রাণের ছোঁয়ায় হয়তো কিছুটা দিন বাঁচার স্বপ্নও দেখতে পারেন নিরহংকারী এই মানুষটি।

স্যার চলে যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু কক্সবাজারবাসীকে কাঁদিয়ে। করোনাকাল বলেই সেই ক্রন্দন কানে বাজছেনা কারো । করোনাকাল বলেই বিদায়ের গণসংবর্ধনাগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে না।
কথায় বলে, ভালো সময় নাকি দ্রুত ফুরিয়ে যায়। কিন্তু আমরা আপনার স্মৃতি ফুরিয়ে যেতে দিবনা কিছুতেই। আমরা সহজে আপনাকে হারাতেও দিবনা। আপনার কীর্তিকর্ম জেগে থাকবে লাখো প্রাণের গহিনে। আপনি যেখানেই থাকুন ভালো থাকবেন, সুন্দর থাকবেন-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
আপনার সুস্থ্ ও দীর্ঘায়ূজীবন কামনা করি সবসময়-প্রতিদিন।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

doeltv38GRD5838
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Developed By BanglaHost