শনিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ০৭:৩৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

কক্সবাজারের ভূমিদস্যু ফেরদাউস: কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার’ আইন উপেক্ষিত

  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৪ মার্চ, ২০২১, ২.৪৬ পিএম
  • ৩০৬ বার পঠিত

কক্সবাজারের ভূমিদস্যু ফেরদাউস: কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার’ আইন উপেক্ষিত

 

 

ইঞ্জি. হাফিজুর রহমান খান, কক্সবাজার::কক্সবাজার সদরের বাঁকখালী নদীর তীরবর্তী উত্তর মুহুরীপাড়ার তিন ফসলী অর্ধশতাধিক একর উর্বর জমি ফিল্মী স্টাইলে ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। দেড়-দুই কিলোমিটার দুরত্বে গড়ে উঠা রেলস্টেশনকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক চিন্তায় ‘আবাসন প্রকল্প’ গড়তেই আইন উপেক্ষা করে রাতে-দিনে এসব জমি ভরাট করছে ভূমিদস্যু চক্র। শতাধিক কৃষক পরিবারের ‘অন্ধের যষ্টি’ তিন ফসলি জমি ভরাট থেকে রক্ষায় জেলা প্রশাসক, কৃষি বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন দিয়েও কোন সুরাহা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ ক্ষতিগ্রস্তদের। অথচ ‘কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার’ আইনে ফসলী জমি ভরাট করে কোন স্থাপনা বা আবাসন প্রকল্প বা শিল্প কারখানা গড়ে তোলার কোন সুযোগ নেই। কক্সবাজার কৃষি বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন মাঠি ভরাট রদে উপযুক্ত আইন পাচ্ছে না বলে দাবি করলেও বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।

 

কক্সবাজার সদর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রমতে, মধ্য ঝিলংজা ব্লকের বাঁকখালী নদীর তীরবর্তী প্রায় ৬০ একর জমি পলি দোআঁশ বেষ্টিত অতি উর্বর ভূমি। এসব জমিতে আমন ও বোরো মৌসুমে প্রায় ১০ হাজার মণ (৪০ হাজার আরি) ধান উৎপাদন হতো। এসব ধানের বিক্রি মূল্য দাঁড়াত প্রায় এক কোটি টাকা। পাশাপাশি আমন মৌসুমে ধানের পাশাপাশি কলমি শাক, কচুর লতি, ঢেরশসহ নানা সবজি এবং বোরো  মৌসুমে বাধা কপি, ফুল কপি, মরিচ, টমেটো, বরবটি, আলু, শীম, চিচিঙ্গা, শসা, ফেলন, ফরাশ বিন, মিস্টি কুমড়া, খিরা, লাউ, লালশাক, পালংশাক, পুই শাক, ডাটা শাক আগাম চাষ হতো। দু’মৌসুমের সবজি জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। এসব সবজি বেঁচে আয় হতো ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। যার উপর নির্ভরশীল প্রায় দেড় শতাধিক কৃষক পরিবার।

 

ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে আবদুর রহমান, সাজেদা বেগম, মনিরুল আলম, জাহেদা বেগম, জাফর আলম, কামরুল ইসমাইলসহ ৩৩ জনের লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, এক সময়ে যাত্রীবাহি বাসের ‘কলারম্যান’ এলাকার ঘরজামাই এএমজি ফেরদাউস তাদের তিন ফসলী জমিগুলো জোরপূর্বক ভরাট করছেন। ‘আবাসন প্রকল্প’ গড়তে বাঁকখালী নদীর তীর ঘেঁষে থাকা জমির পর এখন বসতবাড়ির লাগোয়া জমিও ভরাট করা হচ্ছে। কিছু বললে জমি বিক্রি করতে অপার করছে। ফসলী জমি বিক্রি করবো না বলার পরও ভূমিদস্যুরা গায়ের জোরে মাটি ভরাট অব্যাহত রাখতে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার চিহ্নিত ও জেল ফেরত সন্ত্রাসীদের ‘চুক্তিভিত্তিক’ এনে পাহারা বসিয়েছে। কেউ নিষেধ করতে এলে তাদের সামনে সন্ত্রাসীরা সশস্ত্র মহড়া দেয়। এতে প্রাণনাশের ভয়ে নিরাশ মনে ফিরে যান জমির মালিকরা। ফলে গত কয়েক মৌসুমে এসব জমিতে কোন ধরণের চাষাবাদ করা সম্ভব হয়নি। এতে খাদ্য সংকটে পড়েছে শতাধিক পরিবার। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে ফসলি জমি ভরাট হলেও সংশ্লিষ্ট কোন দপ্তর তার বিরুদ্ধে আইনগত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। উল্টো প্রতিবাদ করা জমির মালিকরা মিথ্য মামলার শিকার ও অব্যাহত হুমকিতে দিনযাপন করছি।

 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত এএমজি ফেরদৌসের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হয়। রিং হলেও ফোন রিসিভ না করায় পাঠানো হয় খুদে বার্তা। তার উত্তরও দেননি, কলও করেনি ফেরদৌস।

 

সরেজমিন দেখা যায়, বাঁকখালী খাল থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করে কৃষি জমিতে রাখা হয়েছে।  একাধিক স্কেবেটর দিয়ে এসব বালু শতাধিক কানি ফসলি জমিতে ছড়িয়ে ভরাট করা হচ্ছে। স্কেবেটর চালক ও শ্রমিকরা জানান, জনৈক ফেরদৌস তাদের ঘন্টা হিসাব মুজুরিতে বালি ভরাটের কাজ করাচ্ছেন। এরবাইরে তারা আর কিছু বলতে চাননি। মাটি ভরাট স্থলে লোকজন দেখে কয়েকজন যুবক হঠাৎ সেখানে আসেন। সংবাদকর্মী পরিচয় দিয়ে তাদের পরিচয় জানতে চাইলে নিজেরা ফটিকছড়ির বাসিন্দা উল্লেক করে সটকে পড়েন। বাড়ির লাগোয়া জমি গুলোতে এখনো শীতকালীন সবজির বাম্পার ফলনের চিহ্ন বিদ্যমান।

 

এদিকে, ‘কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার’ খসড়া আইনের ৪ ধারার (১) উপধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের যে স্থানে কৃষি জমি রয়েছে, তা এই আইনের মাধ্যমে সুরক্ষা করতে হবে এবং কোন ভাবেই তার ব্যবহার ভিত্তিক শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। ১ এর (ক) উপধারায় বলা হয়েছে কৃষি জমি একফসলী বা একাধিক ফসলি যাহাই হউক না কেন তাহা কৃষি জমি হিসাবেই ব্যবহার করতে হইবে। উপধারা (খ)-এ বলা হয়েছে কোন কৃষি জমি নষ্ট করে আবাসন বাড়িঘর, শিল্প-কারখানা, ইটের ভাটা বা অন্যকোন অকৃষি স্থাপনা কোন ভাবেই নির্মাণ করা যাবে না। তবে অনুর্বর, অকৃষি জমিতে আবাসন, বাড়িঘর, শিল্প-কারখানা প্রভৃতি স্থাপন করা যাইবে। ‘কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার’ আইনে বলা হয়েছে ‘কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইন অমান্য বা লংঘন করলে অনূর্ধ ৫ বছর সশ্রম কারাদন্ড বা সর্বনিম্ন ১ লাখ টাকা হতে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে।

 

কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আতিক উল্লাহ বলেন, মধ্য ঝিলংজা ব্লকে ভরাটরত জমি অতি উর্বর। এভাবে কৃষি জমি ধ্বংস হলে জেলায় খাদ্য সংকট দেখা দেয়ার শংকা রয়েছে। আমরা পরামর্শ দিতে পারলেও কাউকে বাধা দিতে পারি না। এ জন্য চেয়ে থাকা ছাড়া কোন উপায় নেই। তবে, তিন ফসলী উর্বর এসব জমি ভরাট রদ করা দরকার।

 

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। একাধিকবার কল দেয়া হলেও ফোন রিসিভ না করায় ডিসির বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

 

কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা (ইউএনও) সুরাইয়া আকতার সুইটি বলেন, কেউ জমি ভরাট করলে তা রদ করার এখতিয়ার আমাদের নেই। তবে, ‘কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার’ খসড়া আইন বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইউএনও বলেন, অভিযোগ পেলে কি করা যায় তা আমরা খতিয়ে দেখবো।

 

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান লে. কর্ণেল (অব.) ফোরকান আহমেদ বলেন, স্থানীয় কিছু লোকের লিখিত অভিযোগ পেয়ে আমাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। কৃষি জমি ভরাট করে কোন আবাসন প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হবে না।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

doeltv38GRD5838
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Developed By ATM News